ছায়া প্রেম

0
325

(২য় পর্ব)

একদিন পরের ঘটনা।যথারীতি রাত আড়াইটার মতো বাজতে চলেছে।তরী ছাদে
সেজেগুজে হাজির।কিছুক্ষণ পর তার ছায়া একটি থেকে দুটি হয়ে গেল।নয়ন তরীর
পাশে এসে বসল।
“আমাকে একটা সত্যি কথা বলবে?”তরী জিজ্ঞাসা করল।
“বলো”
“তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না?”
নয়ন কোন কথা বলছে না।
“কি ব্যাপার বলো”
“হ্যাঁ”
“তাহলে কেন তোমার কাছে আমাকে নিচ্ছো না?”

“তুমি তো আমার কাছেই আছো”
“এটা কাছে থাকা নয়।এটা কাছে আসা নয়।আমি তোমার কাছে যেতে যাই”
“সেটা সম্ভব নয় তরী”নয়ন বলল।
“কেন সম্ভব নয়?”
“আমার একটা সীমাবদ্ধতা আছে”
“কি সেই সীমাবদ্ধতা?যার কথা তুমি সবসময়ই বলো”
নয়ন কিছু বলছে না।
“অন্তত এটা বলো তুমি আমার জীবনে কিভাবে আসলে ?তুমি কোথায় থাকো প্লিজ
কিছু বলো।আমি তোমার জন্য সব করতে পারি ।আমি সত্যি তোমাকে অনেক
ভালোবেসে ফেলেছি।আমি তোমাকে হারাতে চাই না”
“তুমি আমাকে কখনো হারাবে না কিন্তু আমার হাতেও সময় আর বেশি নেই।এই
দুনিয়ার মায়া কাটানোর সময় হয়ে গেছে আমার”,নয়ন বলল।
“কি বলছো তুমি এসব?আমি তোমার সাথে দেখা করব প্লিজ। আমি তোমার কাছে
যাবো”
“তুমি আমাকে দেখলে আমাকে মেনে নিতে পারবে না তরী”
“কেনো পারব না?আমি পারব ।তুমি আমাকে তোমার কাছে যাওয়ার উপায় বলো।“
নয়নের ছায়া আর দেখা যাচ্ছে না।চলে গেছে ইতোমধ্যেই।তবে যাওয়ার আগে একটা
কাগজ দিয়ে গেছে তরীকে।তরী জানে তরীকে এখন কি করতে হবে।তরী দ্রুত ওর
বেস্ট ফ্রেন্ড মিথিলাকে ফোন করল।তরীর কথামত মিথিলা সকাল সকাল এসে হাজির
তরীর বাসার সামনে।তরী কাউকে কিছু না জানিয়ে বেড়িয়ে গেল।ওরা সিলেট
যাবে।সিলেট খুব ভালোভাবে চেনা তরীর।এর আগে অনেকবার গেছে ও।প্রকৃতি ওকে
সবসময়ই টানে।

মিশুক সাহেব সকাল বেলা টেলিফোন পাওয়ার পর থেকে হতবিহবল হয়ে পড়েছেন।কি
করবেন কিছু বুঝতে পারছেন না।কারণ তরীকে সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।
মিশুক সাহেব নিজেই আরেকবার ইকবাল সাহেবকে ফোন দিলেন কেননা তিনি মনে
করেন একটা মানুষের পুরোপুরি ১০০% চেনা সম্ভব নয়।তবে মানুষ তার প্রায় ৭০-
৮০% তাদের বেস্ট ফ্রেন্ডদের সাথে শেয়ার করে থাকে তাই মিশুক সাহেবের একটাই
আশা এই যে তিনি তরীর কোন বেস্ট ফ্রেন্ড এর নাম্বার তিনি পাবেন।ওপাশ থেকে
ইকবাল সাহেব ফোন ধরলেন আর মিশুক সাহেব তার কথাটি বললেন।ইকবাল সাহেব
তার স্ত্রীর থেকে তরীর বেস্ট ফ্রেন্ড মিথিলার নাম্বার জোগাড় করে দিলেন।মিশুক
সাহেব দেরী করলেন না।সাথে সাথে ফোন দিলেন প্রদত্ত নাম্বারটিতে।মিথিলা মিশুক
সাহেবের পরিচয় জানার পর তাকে ঠিকানা সহ সবকিছু খুলে বলল।মিশুক সাহেব
ততঃক্ষণে বেরিয়ে পরেছেন সিলেটের উদ্দেশ্যে।

তরীদের ঠিকানা মতো পৌছাতে রাত প্রায় ১০ টা বেজে গেল।তরী ঠিকানা মতো
পৌছে দেখলো সেখানে একটা ভগ্নপ্রায় মাজার রয়েছে আর একটা এতিমখানা
রয়েছে।ছোট ছোট বাচ্চাদের হেফজ করা হয় এখানে।একটা ৭-৮ বছরের ছেলে
তরীদের দেখে এগিয়ে আসলো।তরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনে কি তরী আফা?”
তরী অনেকটা অবাক হল।হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানালো।
“আসেন আমার সাথে”,তরীকে উদ্দেশ্য করে ছেলেটা বলল।
“তুমি কিভাবে জানলে আমার নাম?”
“নয়ন ভাই কইছে আপনাগো আহোনের কতা।“
তরীর মনটা হঠাৎ খুব ভালো হয়ে গেল।এতদিনের সুখস্বপ্ন আজকে তার সত্যি হতে
যাচ্ছে।আজকে সে সত্যি সত্যি নয়নের কাছে যেতে পারছে।কিন্তু সেই সাথে মনের এক
কোণে নয়নকে হারানোর এক ভয় অনুভূত হলো তার।সে কাঁদছে।

“ঐযে দেখতে পাইতাছেন বাঁশের মাচায় একজন হুইয়া আছে।উনিই আমগো নয়ন
ভাই”,ছেলেটা বলে চলে গেল।
তরী আস্তে আস্তে নয়নের দিকে এগিয়ে গেল।
“এসেছো তুমি?”নয়ন জিজ্ঞাসা করল
“হ্যাঁ এসেছি “তরী জবাব দিল।
“রাস্তায় কোন সমস্যা হই নি তো আসতে?”
“না, কোন সমস্যা হই নি”
“তোমার এ অবস্থা কেনো?”
নয়নের বসতে খুব কষ্ট হচ্ছে।সে বসতে পারছে না।তরীর কাঁধে ভর দিয়ে বসার
চেষ্টা করল।
“ আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে।আমাকে চলে যেতে হবে।আজকে রাতটা পূর্ণিমার
রাত।খেয়াল করেছো তুমি?পাহাড়ে থেকে চাঁদের আলো আর আকাশভরা তারার রাজ্যে
জানো হারিয়ে যাওয়া খুব সহজ কাজ।চলো আমরা জোসনা দেখি”,নয়ন বলল।
“এসব কি বলছো?তোমার কিছু হবে না।আমি তোমার পাশে আছি দেখো।তোমার
কিচ্ছুটি হতে দেব না আমি। চলো তারা গুনি”
নয়ন আর তরী বাঁশের মাচায় বসে আছে।আকাশের তারা দেখছে।নয়ন ওর মাথা
তরীর কাঁধে রেখে আকাশ দেখছিল আর তরী গল্প শুনাচ্ছিল।হঠাৎ নয়ন বলে উঠল,
“একবার বলো না সেই কথাটা যেই কথাটা আজ আমাকে তোমাকে পরস্পরের খুব
কাছে নিয়ে এসেছে।“
“আমি তোমাকে ভালোবাসি”তরী বলল।
নয়ন আর কিছু বলে নি শুধু বলেছিল আমিও তোমাকে ভালোবাসি।তারপর তরীর
কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরেছিল।সেই ঘুম আর কখনো ভাঙে নি।তরীর গগনবিদারী

চিৎকার পুরো প্রকৃতিকে করে তুলেছিল ভারাক্রান্ত।নয়ন চলে গেছে না ফেরার দেশে
।অনেকদূর চলে গেছে।অনেকদূর…

মিশুক সাহেব ঐ অঞ্চলে গিয়ে নয়নের ব্যাপারে সব তথ্য জোগাড় করেছেন।তিনি খুব
অবাক হয়ে আছেন নয়নের ব্যাপারে এসব তথ্য পেয়ে।নয়নের বাবা ছিলেন একজন
পীর।নয়ন ওর বাবার সাথেই থাকতো।নয়নের বাবা মারা যাওয়ার পর মাজার আর
এতিমখানা চালোনোর দায়িত্ব পরে নয়নের উপর।নয়ন নাকি ব্রেন টিউমারে লাস্ট এক
বছর আক্রান্ত ছিল।আরও ছয় মাস আগেই নাকি ডাক্তাররা তাকে রিটার্ন দিয়ে
দিয়েছিল।কিন্তু নয়নের ছিল অদ্ভুত ক্ষমতা।ও চাইলেই ও যাকে চায় তার সাথে দেখা
করতে পারত ।এখবর এলাকাবাসীর থেকে মিশুক সাহেব জানতে পেরেছেন।নয়নের
পার্সোনাল ডায়েরী থেকে মিশুক সাহেব এও জানতে পেরেছেন যে তরী যখন সিলেট
ঘুরতে আসে তখন নয়ন কোন এক কারণে দেখে ফেলে তরীকে।আর নয়ন যেহেতু
চাইলেই কারো সাথে দেখা করতে পারত তাই তার ব্যাপারটা খুব একটা কঠিন কাজ
ছিল না।কিন্তু মিশুক সাহেব কোনভাবেই মিলাতে পারছেন না একজন মানুষ কিভাবে
ছায়া হয়ে দেখা করতে পারবে।তার বিজ্ঞান এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।সে মিলাতে
পারছে না।
এরপর তরী ঢাকায় চলে এসেছিল।তবে সেই এতিমখানা এখন তরী চালায় আর
মাজার সেই অঞ্চলের মানুষ জন চালাচ্ছে।আর তরী ফোন করেছিল মিশুক সাহেবকে
যে সে এখন প্রতিদিনই নয়নকে দেখে আর সে চায় না কোন ধরনের মেডিসিন বা
চিকিৎসা।সে নয়নকে হারাতে চায় না। মিশুক সাহেব বারান্দায় বসে বৃষ্টি
দেখছিলেন।তার বৃষ্টি খুব প্রিয়।রাফসান সাহেব(তার বেস্ট ফ্রেন্ড) ও তার সাথে
মুখোমুখি বসা।বৃষ্টি মানুষকে নিয়ে যায় তার অতীতে।কখনো বা দেখা যায় জেগে
ওঠে সুখকর সময়ের মূহুর্ত গুলোর কথা আবার কখনো বা কেউ না জানা গল্পগুলো
ভেসে ওঠে মনের ক্যানভাসে।চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে মিশুক সাহেব হঠাৎ
খেয়াল করলেন তার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে কাপে।তিনি কোথায়
হারিয়ে গেছেন তিনি জানেন না।একটা সিগারেট ধরালেন।ধোঁয়া ছাড়ার সময় খেয়াল
করলেন ধোঁয়া খুব গাঢ় অর্থাৎ ঘনত্ব খুব বেশি হয়ে আছে যার জন্য ধোঁয়া খুব

বেশি হচ্ছে ।এর কারণ টা জেনো কি তার মনে পড়ছে না।সিম্পল সাইন্স এর মধ্যে
আছে আর কিছুই না অথচ তার মনে পড়ছে না।তার কোনকিছুই এখন আর ভালো
লাগছে না কারণ সে নিজেও জানে না। ইট পাথরের এই শহরে সবার মনকে
কৃত্রিমতা হয়তো নিজের মতো করে তুলতে পারে নি আবেগহীন। ফারহান অতসীর
মতো নয়ন তরীও একটা অসমাপ্ত গল্প বৈকি আর হয়তো কিছুই নয়।থাকুক না
অসমাপ্ত ।কিছু গল্প অসমাপ্তই ভালো লাগে।অসমাপ্ত গল্পগুলোর হয়তোবা সমাপ্তিটা
আমি জানি না আবার হয়তোবা প্রকৃতি নিজের মতো করে একটা সমাপ্তির গল্প
সাজাবে।কেই বা জানে কখন কি হবে।প্রকৃতির খেলা আসলেই বোঝার সাধ্য নেই
কারো। মিশুক সাহেব সিগারেটের শেষ টান দিতে দিতেই তার পার্সোনাল ডায়েরীটার
১৯নং পাতায় লিখে রাখলেন-
“ছায়াপ্রেম-
অসমাপ্ত গল্প”

লেখকঃ জুনায়েদ ইসলাম
দ্বাদশ শ্রেনি,এস ও এস হারম্যান মেইনার কলেজ,ঢাকা

Print Friendly, PDF & Email