কর্ণফুলী নদীর ২৩ ফুট গভীরেও মিলছে না মাটি

0
122

দখলে দূষণে বিপর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর তলায় মিলছে না মাটির নাগাল। ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের আওতায় ২৩ ফুট খননের পরও উঠে আসছে প্লাস্টিক বর্জ্য। এমন তথ্য জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক কমান্ডার মোহাম্মদ আরিফ। তিনি বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে অনেক শক্তিশালী ড্রেজার দিয়েও কর্ণফুলীর তলদেশ ড্রেজিং করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে গত দুই বছরে এ প্রকল্পের মাত্র ৩১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তিনি জানান, ১৯৯০ সালে কর্ণফুলীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং হয়েছিল। নিয়মানুযায়ী দশ বছর পর পুনরায় ক্যাপিটাল ড্রেজিং করার কথা। কিন্তু নানা জটিলতায় তা হয়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০০৮ সালে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নিলেও কাজ শুরু হয় ২০১১ সালের ৫ই জুলাই। ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও ব্যাংক প্রটেকশন নামের প্রায় ২৩০ কোটি টাকার ওই প্রকল্পটির কাজ পেয়েছিল মালয়েশিয়ার মেরিটাইম এন্ড ড্রেজিং করপোরেশন। এই কোমপানি আরেকটি কোমপানিকে সাব কন্ট্রাক্ট দেয়। কিন্তু নানা দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্পের কোটি টাকা নিয়ে গা ঢাকা দেয় মালয়েশিয়ান কোমপানি ও তাদের দেশীয় এজেন্ট। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ১৩ই জুলাই বন্দর কর্তৃপক্ষ চুক্তিটি বাতিল করে। নানা আইনি জটিলতা শেষ করে দুই বছর আগে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। চীনা কোমপানি ই-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পের কাজ পায়। প্রকল্পের আওতায় সদরঘাট থেকে বাকলিয়ার চর পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ২৫০ মিটার চওড়া এলাকায় ড্রেজিং করার কথা। কিন্তু প্লাস্টিক বর্জ্যের বিশাল স্তরের কারনে তা পদে পদে বাধার কবলে পড়ছে। প্রকল্প পরিচালক জানান, ড্রেজিংয়ের জন্য প্রথমে ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের কাটার আনা হয়। এতে ব্যর্থ হয়ে আনা হয় ৩১ ইঞ্চি কাটার। সেটা দিয়েও কাজ করা কঠিন হয়ে উঠে। রাতে দিনে অন্তত ১৬ ঘণ্টা ড্রেজিং করার আশায় চীন থেকে অত্যাধুনিক কাটার আনা হলেও দিনে গড়ে এক ঘন্টাও কাজ করা সম্ভব হয়নি। এ পর্যন্ত ২৩ ফুট গভীরে খনন করেও মাটির নাগাল মিলছে না। উঠে আসছে শুধু প্লাস্টিক বর্জ্য। কর্ণফুলী নদীর গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী বলেন, কর্ণফুলী নদী কোন সাধারণ নদী নয়। এটি শুধু চট্টগ্রামেরই নয়, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রাকৃতিক সমপদ। শুধুমাত্র জোয়ার ভাটা থাকার কারণে নদীটি এখনো কোন রকমে টিকে আছে। তিনি বলেন, তিন বছর আগেও নদীর গড় গভীরতা ৩-১১ মিটার ছিল। এখন এই গভীরতা নেই। ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। এতে জোয়ারের পানির উচ্চতা বাড়ছে। ফলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার চেয়ে এসব এলাকা নিচু হওয়ায় ভাটার সময় দ্রুত সেই পানি নামতে পারছে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। পরিবেশ বিধ্বংসী প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার ও পাহাড় খেকোরাই কর্ণফুলী নদী ধ্বংস করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় ক্যাপিটাল ড্রেজিং করে কর্ণফুলীর তলা থেকে প্লস্টিক বর্জ্য একবারেই উপড়ে ফেলতে হবে। এখন যা হচ্ছে তাতে কোনরকমে বন্দর চ্যানেল টিকে থাকবে। নদীর স্বাভাবিক গভীরতা কোন অবস্থাতেই ফিরে আসবে না। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহর একটি অপরিকল্পিত, সমন্বয়হীন, নজরদারিবিহীন নগর। এই শহর নিয়ে কোন স্টাডি নেই। কোন সমীক্ষা নেই। উন্নয়নের নামে অপরিণামদর্শী কার্যক্রম চলছে। যার ধকল সামলাতে গিয়ে কর্ণফুলী স্বাভাবিক প্রবাহ হারাচ্ছে। যা বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।  খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সমপাদক সৈয়দ ছগীর আহমদ বলেন, প্রতিদিন জোয়ারের পানিতে ভাসছে চট্টগ্রাম। কর্ণফুলীর গভীরতা না বাড়লে এই সংকটের সুরাহা হবে না। নিয়মিত ড্রেজিংয়ে জাহাজ চলাচলের চ্যানেলটির গভীরতা ঠিক থাকলেও অন্যান্য অংশে ডুবো চর বাড়ছে। ভাটার পর কর্ণফুলীর অস্তিত্বহীনতা দৃশ্যমান হয়ে উঠে।  তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা কমাতে সিডিএ খালগুলোর মুখে যে স্লুইসগেট বসাচ্ছে সেগুলো চালু হলে হয়তো কিছুটা সুফল পাওয়া যাবে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সুফলের জন্য মাস্টারপ্ল্যান করে কর্ণফুলীকে আগের অবস্থায় নিয়ে যেতে হবে। ফিশারীঘাটসহ নানা ধরনের স্থাপনার মাধ্যমে যেভাবে নদী দখল করা হয়েছে সেগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email